
ছবি-সংগৃহীত।
বিশেষ প্রতিনিধি //
পাথর শ্রমিক-চোরাচালান লাইনম্যান অতঃপর সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের ভাগিনা পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ মিলেছে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জনৈক হুমায়ুন নামের এক কথিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এনিয়ে স্থানীয় এলাকার জনমনে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতার পালাবদল হলেও খোলস পাল্টায়নি বহুরূপী হুমায়ুন। খনিজ সম্পদে ভরপুর গোয়াইনঘাট উপজেলা। বালু, পাথর, কয়লা, চোরাচালানসহ প্রত্যেক খাত থেকেই দু’হাতে কামাই করছে কাড়ি কাড়ি টাকা। জুলাই-আগষ্ট গণঅভ্যুত্থান বাধাগ্রস্থ করতেও সে ব্যয় করেছিল বিপুল অর্থ। বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলেছিল বড়ো একটি লাটিয়াল বাহিনী।
এর আগে বেশ কয়েকবার তিনি পত্রিকার শিরোনাম হলেও কোন এক অদৃশ্য শক্তির কারনে থেকে যায় আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাবেক রাষ্ট্রপতির ভাগিনা পরিচয়ে চষে বেড়িয়েছে পুরো গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন।
সরেজমিন অনুসন্ধানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, জুলাই আগষ্টে ছাত্র জনতার উপর হামলা চালায় সে ও তার লাটিয়াল বাহিনী। সম্প্রতি এর প্রতিবাদে তার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেছে ছাত্র জনতার আন্দোলনরত সদস্য ও সমন্বয়করা। কিন্তু রহস্যজনক কারনে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বীরদর্পে সে প্রকাশ্যে দিবালোকে চলাফেরা করছে। যদিও তাকে ৪৮ ঘন্টার ভেতরে গ্রেপ্তার পূর্বক আইনের আওতায় নিয়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আল্টিমেটাম দিয়েছে আন্দোলনরত সদস্য ও সমন্বয়করা। এতেও কোন কাজ না হলে ওসি প্রত্যাহার সহ থানা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করা হতে পারে বলে জানিয়েছে ওই সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পর্যটন জাফলং এলাকার একাধিক বালু-পাথর ব্যবসায়ি প্রতিবেদক’কে জানিয়েছেন, পরিবেশ বিনষ্ট করে বোমা মেশিন ও স্কেবেটর দ্বারা এখনো নয়াবস্তির জুমপাড় এলাকায় প্রতিরাতে পাথর উত্তোলন করা হয় হুমায়ুনের নেতৃত্বে। জাফলং নদী থেকেও উত্তোলন করা হয় বিপুল পরিমাণ বালু। এছাড়া তার নেতৃত্বে চলে উপজেলা এলাকার চোরাচালান সিন্ডিকেট গ্রুপ। বিনিময়ে হাতিয়ে নেন কাড়ি কাড়ি টাকা চাঁদা। সেই চাঁদার ভাগ বাটোয়ারার একটি অংশ চলে যায় কতিপয় অসাধু পুলিশ সদস্য ও ইউএনও অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে। তার বিরুদ্ধে এসকল সত্য ঘটনা প্রকাশ করতে গেলে সংবাদকর্মীদের পড়তে হয় মামলা মোকাদ্দমায়। বড়ো অংকের টাকা ব্যয় করে দৌড়ঝাঁপ দেয় আদালত পাড়ায়। কখনো আইসিটি মামলা আবার কখনো ষড়যন্ত্রমুলক মিথ্যা বানোয়াট মোকাদ্দমা দিয়ে সংবাদকর্মীদের হেয় প্রতিপন্ন করা তার নেশা-পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্রটি আরও জানায়, গোয়াইনঘাট থানার ওসি সরকার তোফায়েল এর নাম বিক্রয় করে এসব কর্মকান্ড চালিয়ে দিচ্ছে হুমায়ুন। সে নিজেকে কখনো শ্রমিক নেতা, নিষিদ্ধকৃত ছাত্রলীগ ক্যাডার, সংবাদকর্মী ও ব্যবসায়ী পরিচয়ে স্থানীয় এলাকায় রয়েছে বহাল তবিয়তে।
হুমায়ুনের নিকটাত্মীয় মোঃ সাইফুল ইসলাম দ্য ডেইলিমর্নিংসান’কে বলেন, হুমায়ুন একজন পাথর কোয়ারী শ্রমিক ছিল, বলা যেতে পারে নিরক্ষর। পরে সে শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা উত্তোলন করে লাইনম্যান হিসেবে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)’কে দিতো। হঠাৎ শুনি সেও নাকি সংবাদকর্মীর কার্ড পেয়ে গেছে?
এরপর জানতে পারলাম সে নাকি রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের ভাগিনা হয়ে গেছে! সেই পরিচয় দিয়ে মোবাইলে ছবি তুলে সাধারন মানুষকে দেখিয়ে ঘুষ, বাণিজ্য সহ চাঁদা আদায় বাণিজ্যে মেতে উটে। জুলাই আগষ্টের আগে ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদাবাজির একটি ভিডিও ভাইরাল হয়।
সেই ভিডিওতে তাকে বলতে শুনা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্টপতি তার কাছের লোক যে কোন সমস্যা তার এক ফোনই যতেষ্ট, গোয়াইনঘাটের সব সাংবাদিক এক পাল্লায় ওজন করলে যা হবে তার ওজন তা হবে!
এ বিষয়ে ১১ নং মধ্য জাফলং ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ও ব্যাবসায়ী সংগঠনের সভাপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন তালুকদার প্রতিবেদক’কে বলেন, হুমায়ুন একজন প্রতারক-চাঁদাবাজ প্রকৃতির লোক। তৎকালীন সরকারের আমলে কিছু অসৎ পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে যোগসাজশ সম্পর্ক গড়ে তোলে পাহাড়সম টাকা কামাই করেছে। বর্তমানেও সে একই পথ অবলম্বন করছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাবাজার এলাকায় আমার সংগঠনের ব্যাবসায়ীদের নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক হুমায়ুন। কেউ তাকে চাঁদা না দিলে নানা ধরণের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করতো। যে কারণে কেউ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস পায়না। তার চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকেই জেল খেটেছে এমনকি দেশ ছাড়াও হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বাউর ভাগ এলাকার ব্যাবসায়ী শাহজাহান মিয়া ও নাইন্দার হাওড় গ্রামের নাসির মুন্সী বলেন, পড়া লেখা না জানা চতুর হুমায়ুন একজন ভুয়া সংবাদকর্মী। চাঁদাবাজিই হল তার মূল পেশা, তাকে চাঁদা দিতেই হবে, চাঁদা না দিলে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করে মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিতো। সম্প্রতি সময়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে মামলার ভয় দেখিয়ে এলাকার ব্যাবসায়ী ও আমাদের নিকট থেকে প্রায় ৮০ লাখ টাকা চাঁদা হাতিয়ে নিয়েছে।
জাফলংয়ের নবম খন্ড এলাকার বিশিষ্ট মুরুব্বী মো.জুলহাস সিকদার বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করে প্রতারক হুমায়ুন। সম্প্রতি সমযে তার একটি বালুর নৌকা আটক করে ১৪ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছে।
তার মামলা-হামলার অত্যাচারে দেশ ছাড়া এক পল্লী চিকিৎসক, মোঃ শাহিন আলম মুঠোফোনে প্রতিবেদককে বলেন, তার ভাই পল্লী চিকিৎসক এবি এম.দুলাল আহমদ নিবন্ধনবিহীন মা মণি প্রকল্প নামক একটি সমিতি পরিচালনা করতো। সমিতির নিবন্ধন না থাকায় সে পুলিশের ভয় দেখিয়ে তার ভাই দুলালের কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে একপর্যায় দুলাল তাকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে বাধ্য হোন। চাঁদার বাকি টাকা পরিশোধ করতে না পারায় সে এক দলিল লেখককে সাথে নিয়ে ৩শ’ টাকার স্ট্যাম্পসহ ভুক্তভোগী পল্লী চিকিৎসক দুলালের মালিকানাধীন মা মণি ফার্মেসীতে গিয়ে স্ট্যাম্প লেখার বিষয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায় উভয়ের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এসময় অসাবধানতা বসত হুমায়ুন মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হন। পরে সে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করে। সেই চাঁদাবাজির রেকর্ডকৃত অডিও ক্লিপ আমাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ওই নামধারী চাঁদাবাজ একাধিকবার মাদকসহ আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রয়েছে ইয়াবা চোরাচালান মামলা। যার জিআর মামলা নং-১৬২/২০১৫। বন বিভাগের গাছ চুরির মামলা। যার জিআর মামলা নং-১৫৩/১৩। সন্ত্রাসী হামলা লুটপাট-ডাকাতি মামলা ১নং জজ আদালত মামলা নং৭/১৬। শিশু অপহরণ ২নং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-৩১৮/১৫।
মাদক, চাঁদাবাজি, শিশু ও নারী নির্যাতন, চুরি-ডাকাতি অপহরণসহ এতো মামলা মোকদ্দমার পরেও ধরাশায়ি প্রতারক চাঁদাবাজ হুমায়ুন। যদিও পতিত স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের আমলে তদবির বাণিজ্য চালিয়ে অধিকাংশ মামলা হতে পার পেয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সেই গণমাধ্যম কার্ডটিও সে কৌশলে উদ্ধার করে নেয়।
এদিকে স্বৈরাচার মুক্ত দেশ গঠন ছাত্রদের অঙ্গীকার নস্যাৎ করতে তার ছেলে ছাত্রলীগ নেতা সানোয়ার ও পিতা হুমায়ুন বিভিন্ন চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। এ সকল অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি হুমায়ুন।
এ ব্যাপারে জানতে গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সরকার তোফায়েল আহমদ এর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দ্য ডেইলিমর্নিংসান’কে বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলার সাথে জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ ছবি শনাক্ত হয়েছে এবং চাঁদাবাজদের তালিকাও প্রস্তুত হয়েছে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।
নিয়মিত সংবাদ পড়ুন, মতামত ব্যক্ত করুন।