
কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি //
স্বপ্ন ছিল একটাই—দারিদ্র্যের বেড়াজাল ভেঙে পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটানো। সেই স্বপ্নের হাত ধরেই কয়েক দেশ ঘুরে গত জুন মাসে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন কালীগঞ্জ পৌরসভার উত্তরগাঁও এলাকার যুবক ইউসুফ হাসান আলিফ (২৭)।
কিন্তু নির্মম ভাগ্যে নিয়তির লেখা বোধহয় অন্যরকম ছিল তার জন্য। কাজের বৈধ অনুমতিপত্র হাতে পাওয়ার আনন্দ স্থায়ী হলো না দুই দিনও। তার আগেই আগুনের নিষ্ঠুর শিখায় নিভে গেল এক তরুণের সব স্বপ্ন, সব সম্ভাবনা।
দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভোরে তার লাশ পৌঁছেছে দেশে।
জানা গেছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে মিলেছিল স্পেনে কাজের অনুমতি। যে দিনটির জন্য এত প্রতীক্ষা, সেই দিনটি যখন এলো, তখন দেশে ফোন করে পরিবারকে খুশির খবর দিয়েছিলেন আলিফ। কিন্তু সেই খুশি টিকল না বেশিক্ষণ। অনুমতি পাওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায়, গত ৩০ আগস্ট স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চিরদিনের মতো থেমে যায় তার জীবন।
মৃত্যুর আগমুহূর্তের সেই দৃশ্য আজও কাঁদায় তার সহকর্মী আর স্বজনদের। আগুনে আটকা পড়ে দম বন্ধ অবস্থায় সহকর্মীদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সাহায্যের আকুতি জানিয়েছিলেন আলিফ।
শেষ বার্তায় লিখেছেন- ‘আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।’
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাঁচার জন্য পাঠানো সেই আকুতিই হয়ে রইল তার জীবনের শেষ কথা। আগুনের গ্রাস থেকে তাকে আর বাঁচানো যায়নি।
গত ৩০ আগস্ট স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে মাদ্রিদের আর গান সোয়েলা জেলার মেট্রো পালোস দে লা ফ্রন্তেরা এলাকার কাইয়ে ক্যানারিয়াস সড়কের একটি বাইসাইকেল গ্যারেজে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতোই সেদিনও ফুড ডেলিভারির কাজে ব্যবহৃত সাইকেল আনতে গ্যারেজে গিয়েছিলেন আলিফ। জীবিকার তাগিদে যে গ্যারেজে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করতেন, সেটিই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ ঠিকানা। হঠাৎই একটি ইলেকট্রিক বাইসাইকেলের ব্যাটারি বিস্ফোরিত হয়ে মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা গ্যারেজে। আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হন আলিফসহ তার আরও দুই সহকর্মী।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে মাদ্রিদ সিটি কাউন্সিলের ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন দমকলকর্মীরা। গ্যারেজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ করা হয়, নতুন করে যাতে আগুন না ছড়ায়, সেজন্য বাকি ইলেকট্রিক বাইসাইকেলগুলো সরিয়ে নেওয়া হয় নিরাপদ দূরত্বে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। ঘটনাস্থলেই চিকিৎসকেরা আলিফকে মৃত ঘোষণা করেন। দগ্ধ অন্য দুই সহকর্মী এখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ছেন তারাও।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে মাটির টানে ফেরা
প্রবাসের মাটিতে প্রাণ হারানো সন্তানকে শেষবারের মতো নিজের দেশে ফিরিয়ে আনার লড়াই সহজ ছিল না। একের পর এক আইনি প্রক্রিয়া, কাগজপত্রের জটিলতা আর দিনের পর দিন অপেক্ষা—দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল এই ফেরার যাত্রা।
গত ৪ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় আলিফের জানাজা। স্পেনে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা সেদিন কাঁধে করে বহন করেছিলেন তার নিথর দেহ, চোখের জলে বিদায় জানিয়েছেন অচেনা এক স্বদেশী ভাইকে।
এরপর আইনি প্রক্রিয়া শেষে ১০ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে (টিকে-১৩৬০) ইস্তাম্বুলের উদ্দেশ্যে রওনা হয় আলিফের কফিনবন্দি লাশ। সেখান থেকে সংযোগকারী আরেকটি ফ্লাইটে চেপে অবশেষে বাংলাদেশের পথে যাত্রা করে তার লাশ।
বিমানবন্দরে তখন অপেক্ষায় ছিলেন শোকে বিহ্বল বাবা। যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কফিনবন্দি লাশ তুলে দেয় তার হাতে। জীবিত ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন যে বাবা, আজ তাকেই বুকে জড়িয়ে ধরতে হলো নিথর কফিন।
নিহত ইউসুফ হাসান আলিফ গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার উত্তরগাঁও এলাকার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুন দম্পতির সন্তান। পেশায় তিনি ছিলেন একজন ফুড ডেলিভারি রাইডার—প্রতিদিন সাইকেলে ছুটে বেড়ানো এক পরিশ্রমী তরুণ, যার স্বপ্ন ছিল প্রবাসে থেকে কষ্টের আয় দিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।
শোকে স্তব্ধ প্রবাস আর জন্মভূমি
আলিফের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্পেন প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। যারা তাকে চিনতেন, যারা তার সঙ্গে একই স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসজীবন শুরু করেছিলেন, তারা আজও মেনে নিতে পারছেন না এই আকস্মিক বিদায়।
একই সঙ্গে সুদূর কালীগঞ্জের উত্তরগাঁও এলাকায় নেমে এসেছে শোকের মাতম। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন আর পরিচিতজনদের চোখে আজও ভাসছে সেই তরতাজা যুবকের মুখ, যিনি একদিন হাসিমুখে বিদেশযাত্রার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন। কারও কণ্ঠে আক্ষেপ, কারও চোখে অশ্রু—গোটা এলাকা যেন ডুবে আছে এক অব্যক্ত বেদনায়।
নিহতের মামাতো ভাই ও বার্সেলোনা প্রবাসী শফিকুল ইসলাম রাসেল এসব তথ্য নিশ্চিত করে জানান, কালীগঞ্জের উত্তরগাঁওয়ে শুক্রবার জুমার নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে আলিফকে।
সংবাদ পড়ুন, মতামত জানান।
Editor and Publisher : Nityananda Sarkar,
News Editor- Arun Sarkar.