
আদালত প্রতিবেদক//
জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল শনিবার শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর এ আদেশ দেন।
এদিন ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর আগে তাকে হাতকড়া ও মাথায় হেলমেট পরাতে যান সিএমএম আদালতের ইনচার্জ এসআই মোরশেদ আলম।
তখন আখতারুজ্জামান বলেন, আমার হাত ধরবেন না, ডোন্ট টাচ মি। এরপর তাকে মাথায় হেলমেট ও হাতকড়া পরানো হয়। তবে প্রিজন ভ্যানের গেটে এসে মাথায় থাকা হেলমেট ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আখতারুজ্জামান। বলেন, কেন আমি হেলমেট পরব। আমি আওয়ামী লীগ না।
এরপর সাংবাদিকদের দেখে তিনি বলেন, হেলমেট ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। সরকারের অবৈধ অর্ডার মানি না। এ সময় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন তিনি। এরপর তাকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।
শুনানির আগে নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আমি বিমানের অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেছি। জুলুম-নির্যাতন করে আমাদের থামানো যাবে না। পরবর্তীতে শুনানি নিয়ে তার এক দিনের রিমান্ড আদেশ দেন আদালত।
শুনানিতে সম্পর্কে মহানগর পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, আখতারুজ্জামান আদালতে আসার শুরুতেই পুলিশের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং পুলিশসহ আদালতে উপস্থিত সবাইকে বের করে দিতে বলেন। তিনি পুলিশ, সাংবাদিকসহ কাউকেই আদালতে রাখতে চাননি এবং আদালত ও প্রসিকিউশন পক্ষের প্রতি বিরূপ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন।
পিপি বলেন, শুনানি চলাকালে আখতারুজ্জামান বিচারককে হেয় করে বলেন, রায় দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই।
পিপি আরও বলেন, আদালতে আখতারুজ্জামান দাবি করেন তিনি বিমানবন্দরে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তখন আদালত তাকে বলেন, প্রতিবাদ করা তার অধিকার। তবে প্রতিবাদের ভাষা সংযত হতে হবে এবং প্রতিবাদ করতে গিয়ে কাউকে আঘাত করা যাবে না।
আদালতের এই জবাবে আখতারুজ্জামান আরও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন বলে দাবি করে পিপি বলেন, আদালত তাকে শান্ত হতে বলছিলেন। তবুও তিনি বারবার বলতে থাকেন যে তিনি এভাবেই চলবেন, দেখে নেবেন কে কী করে।
এর আগে শুক্রবার বিকাল ৫টার দিকে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে আখতারুজ্জামান গ্রেফতার হন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় হওয়া মামলায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
মামলাটি করেন বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে মদিনা থেকে আসা বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীদের চাপ ছিল। এ কারণে ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলি সংকট দেখা দেয়। একই সঙ্গে লাগেজ পেতেও দেরি হচ্ছিল। এ সময় ঢাকা-৫ আসনের সংসদ-সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের আহ্বানে ঘটনাস্থলে যান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ। তিনি (রাগীব সামাদ) পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এরই মধ্যে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান নির্বাহী পরিচালকের দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান। তাকে গালি ও হুমকি দেন। বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী সম্পর্কেও তিনি অশালীন মন্তব্য করেন।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা প্রটোকল সহকারীরা বিমানবন্দরের সংরক্ষিত (কেপিআই) এলাকায় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ শুরু করলে। দায়িত্বরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাদের ভিডিও ধারণে নিষেধ করেন।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আখতারুজ্জামান ওই নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে গালি দেন। একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এছাড়া সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলে ক্ষতিসাধন এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন।
এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সংরক্ষিত ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আখতারুজ্জামান কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। একাদশ সংসদের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নৌকার প্রার্থীর কাছে হেরে যান। এরপর ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করে পরাজিত হন।
তিনি একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাকে পঞ্চমবার বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।
এদিকে ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি দিতে দেরি হওয়ার ঘটনায় দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তারা হলেন ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধান ও ফ্লাইট সুপারভাইজার সাদ্দাম হোসেন। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
মতামত জানান।