
জকিগঞ্জ থেকে ঘুরে এসে, জামাল আহমদ, স্টাফ রির্পোটার (সিলেট) :
ছবি সংগৃহীত। সিলেটের জকিগঞ্জে জলমহাল নীতিমালা লঙ্ঘন করে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইজারা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এনিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, জকিগঞ্জ উপজেলার ২০ (বিশ) একরের নিচে সউলজুরী, এরালীজুরী, কালীজুরী সম্প্রতি জলমহালটি বিগত মাসের শেষ দিকে ইজারা প্রদানের জন্য আহ্বান করে জকিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন কতৃপক্ষ। এরপর শুরু হয় নাটকিয়তা। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জলমহালের নীতিমালা তোয়াক্কা না করে একটি প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় থেকে গড়ে ওঠা নামে-বেনামে কথিত বহিরাগত অমৎসজীবী সদস্য দিয়ে গঠন করা সমিতির নামে দেয়া হচ্ছে এসকল জলমহাল। হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে বড়ো অংকের উৎকুচ। এতে প্রকৃত মৎসজীবীরা চরম বিপাকে। মানা হচ্ছেনা জলমহালের নিকটবর্তী তীরবর্তী আইনত বিধিনিষেধ। আর এর নাটের গুরু হলেন, উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ‘এসিল্যান্ড’ প্রণয় বিশ্বাস ও সমবায় অফিসার মোহাম্মদ ফখর উদ্দিন। এর সাথে জড়িত রয়েছেন সরকারী মাঠ সার্ভেয়ার নিজেও।
সরেজমিন অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, সমিতি অডিট করার নামে সমবায় অফিসার ফখরউদ্দিন ১০ (দশ হাজার টাকা)’র নিচে হাদিয়া গ্রহণ করতে রাজি নয়। এতে অমৎসজীবী সমিতি হোক বা মৎসজীবী সমিতি সেটা তার কাছে কোন বিষয় না। অথচ সমিতি গঠনের নীতিমালা হল জলমহালের আশপাশ এলাকার মৎসজীবী ছাড়া সমিতি গঠন করা যাবে না। অবশ্যই সেই মৎসজীবীরা হতে হবে জলমহালের নিকটবর্তী ও তীরবর্তী এলাকার। কিন্তু রহস্যজনক হলেও সত্য যে, প্রভাবশালী ধনাঢ্য কথিপয় ব্যাক্তির প্ররোচনায় পড়ে এসব নীতিমালাকে তোয়াক্কা করতে নারাজ ক্ষুধে এসিল্যান্ড অফিসার ও সমবায় কর্মকর্তা। অনুসন্ধ্যানে কথিত একটি সবুজ কুড়ি সমবায় সমিতির নাম বেরিয়ে এসেছে। উপজেলার কালিগঞ্জ বাজারের পশ্চিম পার্শ্বে জান্নাত পার্কে কর্মরত রয়েছেন ওই সমিতির কথিত নামধারী মৎসজীবী সভাপতি নিজে। লোকচক্ষু আড়ালে তিনি মৎসজীবী সেজে বহিরাগতদের দিয়ে বড় অংকের উৎকুচের বিনিময়ে কৌশলে গঠন করেছেন সবুজ কুড়ি সমবায় সমিতি। এর ফলে নীতির কাছে হারতে বসেছেন প্রকৃত মৎসজীবীরা।
অভিযোগ রয়েছে ওই সমিতির আড়ালে কলকাঠি নাড়ছেন বর্তমান সরকার দলের একাধিক কতিপয় নামধারী নেতাকর্মী। দলের প্রভাব কাটিয়ে উপজেলা প্রশাসনকে চাপে রেখে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে জলমহাল। অপরদিকে গতকাল ৩ জুন এর প্রতিকার চেয়ে দাউদপুর প্রগতি মৎসজীবী সমবায় সমিতি জকিগঞ্জ, সিলেট’র সভাপতি নিজে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন, ইতিপুর্বে সউলজুরী, কালীজুরী, এরালীজুরী জলমহালটি লিজ নিয়ে মৎস্য আহরণ করেছেন। সম্প্রতি বছর ইজারায় অংশ নিয়েছেন। জলমহালটি এখনো কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। অপর অংশগ্রহণকারী কথিত কিছু লোক দাউদপুরের কয়েকজন, কোনাগ্রামের কয়েকজন ছাড়া বেশিরভাগ লোকজন বহিরাগত সদস্য। এদের মধ্যে কালিগঞ্জ ও রতনগঞ্জ এলাকার লেবাসধারী লোক বিদ্যমান রয়েছে। তারা আইনকে তোয়াক্কা না করে বিগত কয়েকদিন আগ থেকে কথিত সমিতির নাম ভাঙিয়ে উক্ত জলমহালে মাছ আহরণ ও জলমহাল অবৈধ ভাবে গোপনে বেচা বিক্রি করিতেছে। এর প্রতিকার চেয়ে তিনি অভিযোগখানা দায়ের করেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মৎসজীবী প্রতিবেদক’কে জানিয়েছেন, সপ্তাহখানিক ধরে সবুজ কুড়ি সমিতি প্রকাশ্যে দিবালোকে ইজারা প্রদানের আগেই জলমহাল ভোগদখল, মাছ আহরণসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার থেকে ইজারা পেয়ে গেছে বলেও স্থানীয় ভাবে গুজব ছড়াচ্ছে। এসময় তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, এসিল্যান্ড অফিসার ও সমবায় কর্মকর্তা সঠিক তদন্ত না করে জলমহালগুলো অমৎসজীবীদের হাতে তুলে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত। জলমহালের কোন নিয়মনীতি তাদের কাছে প্রাধান্য নয়। তারা আরও বলেন, একজন অসহায় হতদারিদ্র মৎসজীবী সমিতির লোক তার টাকার প্রয়োজনে বাড়ির কিছু যায়গা বন্ধক রেখে টাকা এনেছিলেন কিন্তু তিনি ভুমি বিক্রয় করেননি তাকে নিয়েও জজমিয়া নাটক সাজিয়েছেন দুর্নীতিবাজ এসিল্যান্ড ও সমবায় কর্মকর্তা ফখরউদ্দিন। তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন ওই ক্ষুধে দুই কর্মকর্তা। তাদের এরকম কর্মকান্ড থেকে রেহায় পেতে তারা উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
কয়েকদফা এবিষয়ে জানতে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানের মুঠোফোনে ও হোয়াটস আ্যাপে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, কোন দলীয় প্রভাব ইজারা প্রদানে প্রাধান্য পাবেনা। সরকারী নিয়মের বাহিরে জলমহাল ইজারা দেওয়া হবেনা। এর আগে পহেলা জুন দিনে তিনি প্রতিবেদক’কে বলেন, জলমহালে কেউ মাছ আহরণ বা দখলে নেওয়ার অপচেষ্টা করলে এর আইনত বিহীত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তখন তিনি বলেন আমি এখনই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যাবস্থা গ্রহণ করতেছি। কিন্তু কথাগুলো রেখে দেন তার হৃদমাঝারে তা আর বাস্তবায়ন করতে দেখা যায়নি। তদন্ত দূরের কথা ‘যেই লাউ সেই কদু’ ! ফের ৩ জুন ইজারা প্রধান প্রসঙ্গে তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি জলমহাল কমিটি দেখছে তারা প্রতিবেদন দাখিল করলে বুঝা যাবে কি অবস্থায় রয়েছে। দায়েরকৃত অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ আপত্তি করলে বিষয়টি আপিল হিসেবে গণ্য করা হবে। পরবর্তীতে যাচাই বাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ইজারা প্রদানের বিষয়ে তিনি বলেন, এখনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। কেউ ইজারা পেয়ে গেছে বললেতো আর হবেনা।
এসিল্যান্ড অফিসার প্রণয় বিশ্বাসের সঙ্গে কথা হলে তিনি হতদারিদ্র মৎসজীবির বিষয়টি প্রথমে স্বীকার করে একপর্যায় অন্যান্য বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এসময় তিনি প্রতিবেদকের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন কোন একটি কারনে জলমহাল ইজারা থেমে থাকতে পারেনা। যদি মনে করেন আইনের বাহিরে কাজ করা হয়েছে, তাহলে আপিল করুন! অন্যান্য তথ্য এভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। এটা আপীল করলে, আপিল কতৃপক্ষকে দেওয়া হবে ভাই? সবশেষে তিনি বলেন, ভুল বুঝতে পেরেছেন!
অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিবেদক বলেন, আমি আপিল করবো কেন? পরবর্তীতে তিনি কোন সদুত্তোর না দিয়েই কথা বলা বন্ধ করে দেন। এনিয়ে সমবায় কর্মকর্তা ফখরউদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি ঘুষ দুর্নীতির বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, সমবায় অফিস হতে যদি কেউ সার্টিফিকেট নিয়ে এসে মৎসজীবি হয়ে যায় তাহলে হতে পারে, সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। অমৎসজীবীদের বিষযে একই কথা বলেন ক্ষুধে অফিসার এসিল্যন্ড।
অন্যদিকে দাউদপুর প্রগতি মৎসজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি রনোজিত বিশ্বাসের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, উক্ত জলমহালে সপ্তাহখানিক আগ থেকে মাছ আহরণসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে অমৎসজীবীরা। এনিয়ে বেশ কয়েকবার এসিল্যান্ড স্যারকে জানিয়েছি কিন্তু কোন প্রতিকার পাইনি। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে একখানা আবেদন করেছি। আশা করছি ন্যায় বিচার পাবো। ইজারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি প্রভাবশালী মহল গোপনে জলমহালটি ইজারা নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কোন কিছু বুঝতে দেয়া হচ্ছেনা। ইজারা আহ্বান করা হয় প্রকাশ্যে আর ইজারা দেওয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে অতি গোপনে, তাও আবার অমৎসজীবী সমবায় সমিতিকে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীণতা ভুগছেন। তাকে ও তার পরিবারের সদস্যসহ সমিতির সদস্যদের যে কোন সময় ষড়যন্ত্রমূলক হামলা, মামলায় জড়াতে পারে প্রতিপক্ষের লোকেরা। তিনি আইনের আশ্রয় নিবেন বলেও জানান।
সংবাদের সাথে সবসময় যুক্ত থাকুন।